Most Recent

কী করলে এক হাজার নেকি লাভ করা যাবে?
দৈনিক এক হাজার নেকি লাভ ও এক হাজার গোনাহ মাফ হওয়া নিশ্চয় মুমিনের জন্য অনেক বড় প্রাপ্তি। কোনো মুমিন এমন সৌভাগ্য হাতছাড়া করতে চাইবে না। প্রিয়নবী (সা.) উম্মতকে এমনই একটি আমল শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘তোমাদের জন্য কি দৈনিক এক হাজার নেকি লাভ করা কঠিন কিছু? তখন এক সাহাবি বলেন, আল্লাহর রাসুল! কী করলে এক হাজার নেকি লাভ করা যাবে? তখন নবীজী বলেন, ‘এক শ বার সুবহানাল্লাহ বললে এক হাজার নেকি লেখা হবে অথবা (কোনো কোনো বর্ণনায়) এক হাজার গোনাহ মোচন হবে। (মুসলিম, হাদিস : ২৬৯৮; ইবনে হিব্বান, হাদিস : ৮২৫)

এ ছাড়া হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি ফজরের নামাজের পর দশবার ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা-শারিকা লাহু। লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু। ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদির’ পড়বে, এর বিনিময়ে তার আমলনামায় চারজন গোলাম আজাদ করার সওয়াব লেখা হবে, ১০টি নেকি লেখা হবে, ১০টি গোনাহ মাফ হবে, ১০টি মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে এবং এ কালিমাগুলো সন্ধ্যা পর্যন্ত তার জন্য শয়তান থেকে রক্ষার কারণ হবে।

মাগরিবের পর পড়লে অনুরূপ সওয়াব মিলবে এবং সকাল পর্যন্ত শয়তান থেকে হেফাজতে থাকবে। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২৩৫১৮; তিরমিজি, হাদিস : ৩৫৩৪)

বিভিন্ন বর্ণনায় রয়েছে, নামাজের বৈঠক থেকে ওঠার আগে, কোনো কথা বলার আগেই এই দোয়া পড়বে। কোনো বর্ণনায় শুধু নামাজের পর পড়ার কথা এসেছে। (তিরমিজি, হাদিস : ৩৫৩৪, ৩৪৭৪; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ১৭৯৯০)

অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘...তার আমলনামায় এক নেকি লেখা হবে, এক শ গোনাহ মাফ হবে এবং একজন গোলাম আজাদ করার সওয়াব পাবে। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ৮৭১৯)

অন্য হাদিসে এসেছে, ইসমাঈল (আ.)-এর বংশধরের একজন গোলাম আজাদ করার সওয়াব পাওয়া যাবে। অন্য বর্ণনায় এসেছে, দশজন গোলাম স্বাধীন করার সওয়াব পাওয়া যাবে। (আবু দাউদ, হাদিস : ৫০৭৭; তিরমিজি, হাদিস : ৩৫৩৪; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২৩৫৬৮)

মোদ্দাকথা, বর্ণনার বৈচিত্র্য ও ভিন্নতা থাকলেও ফজর এবং মাগরিবের পর এই দোয়া-আমলের মাধ্যমে আল্লাহ বান্দার গোনাহ মাফ করেন। তাকে সওয়াব দিয়ে পুরস্কৃত করেন। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন।

news zone
বিপদ-আপদ থেকে মুক্তির দোয়া
বিপদ-আপদ মানুষের নিত্যসঙ্গী। বিপদ কখনও বলে-কয়ে আসে না। কখন কার ওপর কোন সমস্যা ও বিপদ নেমে আসে তা কেউ জানে না। স্বাভাবিকভাবে বিপদ বা সঙ্কটে পড়লে মানুষ হতবিহ্বল হয়ে যায়। মানুষের চিন্তা-ভাবনা বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে, মানুষ দিশেহারা হয়ে করণীয় ভুলে যায়।

তবে বিপদে পড়লে সবার প্রথমে আল্লাহ তায়ালার কাছে বিপদ থেকে সাহায্য চাইতে হয়। তিনিই একমাত্র উদ্ধারকারী। তিনি চাইলে মুহূর্তেই যেকোনো বিপদ থেকে মুক্তি দিতে পারেন। সব ধরেনের পেরেশানি দূর করে দিতে পারেন।

বিপদাপদ থেকে পরিত্রাণের জন্য কুরআন এবং রাসুলুল্লাহ সা.-এর হাদিসে কিছু দোয়া ও আমলের কথা বর্ণিত হয়েছে। হজরত আনাস রা. বলেন, যখন হজরত রাসুলুল্লাহ সা.- এর ওপর কোনো কাজ কঠিন হয়ে দেখা দিত, তখন তিনি এ দোয়াটি পড়তেন। -তিরমিজি: ২৪৫৪

উচ্চারণ: ইয়া হাইয়্যু ইয়া কাইয়্যুমু বিরাহমাতিকা আসতাগিছু। অর্থ: হে চিরঞ্জীব! হে বিশ্ব চরাচরের ধারক! আমি তোমার রহমতের আশ্রয় প্রার্থনা করছি।

হজরত রাসুলুল্লাহ সা. বলেন, মাছের পেটে ইউনুস আ. এ দোয়া পড়ে আল্লাহ তায়ালাকে ডেকেছিলেন এবং মুক্তি পেয়েছিলেন। যদি কোনো মুসলিম বিপদে পড়ে এ দোয়া পাঠ করে, আল্লাহ তা কবুল করবেন। –সুনানে তিরমিজি: ২২৯২

উচ্চারণ: লাইলা-হা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতুমিনাজ্জালিমিন। -সূরা আম্বিয়া: ৮৭। অর্থ: হে আল্লাহ! তুমি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তুমি মহাপবিত্র। নিশ্চয়ই আমি সীমা লঙ্ঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত।

বিপদ-মসিবত থেকে বেঁচে থাকতে এই দোয়াগুলোও পাঠ করা যেতে পারে।

উচ্চারণ: ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন, আল্লাহুম্মা আজিরনি ফি মুসিবাতি ওয়া আখলিফলি খাইরাম মিনহা।

অর্থ: আমরা আল্লাহর জন্য এবং আমাদেরকে তারই দিকে ফিরে যেতে হবে। হে আল্লাহ! বিপদে আমাকে সওয়াব দান করুন এবং যা হারিয়েছি তার বদলে তার চেয়ে ভালো কিছু দান করুন। -সহিহ মুসলিম

অন্য আরেক হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, হজরত ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হজরত রাসূলুল্লাহ সা. বিপদের সময় এই দোয়াটি পাঠ করতেন- উচ্চারণ: লা ইলাহা ইল্লাল্লাহুল হালিমুল হাকিম, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু রাব্বুল আরশিল আজিম, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু রাব্বুস সামাওয়াতি ওয়াল আরদি- ওয়া রাব্বুল আরশিল কারিম।

অর্থ: আল্লাহ ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই, তিনি পরম সহিষ্ণু ও মহাজ্ঞানী। আল্লাহ ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই, তিনি মহান আরশের প্রভু। আল্লাহ ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই, তিনি আকাশমন্ডলী, জমিন ও মহাসম্মানিত আরশের প্রভু। -সহিহ বোখারি ও মুসলিম।

দোয়া  কবুলের বহুঘটনা থেকে কিছু ঘটনা নিয়ে লেখা হয়েছে দু’য়া কবুলের গল্পগুলো ।

news zone
ঋণ ফেরত দেয়ার ঐতিহাসিক অলৌকিক একটি ঘটনা
লায়স রহ. আবূ হুরায়রা রা. হতে থেকে বর্ণিত আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,  বনি ইসরাঈলের কোন এক ব্যক্তি বনি ইসরাঈলের অপর এক ব্যক্তির নিকট এক হাজার দীনার ঋণ চাইল। তখন সে (ঋণদাতা) বলল, কয়েকজন সাক্ষী আনো, আমি তাদেরকে সাক্ষী রাখব। সে বলল, সাক্ষী হিসাবে আল্লাহই যথেষ্ট।

তারপর (ঋণদাতা) বলল, তা হলে একজন যামিনদার উপস্থিত করো। সে বলল, যামিনদার হিসাবে আল্লাহই যথেষ্ট। ঋণদাতা বলল, তুমি সত্যই বলেছ। এরপর নির্ধারিত সময়ে তাকে এক হাজার দীনার দিয়ে দিল।

তারপর ঋণ গ্রহীতা সামুদ্রিক সফর করল এবং তার প্রয়োজন সমাধা করে সে যানবাহন খুঁজতে লাগল, যাতে সে নির্ধারিত সময়ের ভেতর ঋণদাতার কাছে এসে পৌঁছতে পারে।

কিন্তু সে কোন যানবাহন পেল না। তখন সে এক টুকরো কাঠ নিয়ে তা ছিদ্র করল এবং ঋণদাতার নামে একখানা পত্র ও এক হাজার দীনার তার মধ্যে ভরে ছিদ্রটি বন্ধ করে সমুদ্র তীরে এসে বলল, হে আল্লাহ! তুমি তো জান আমি অমুকের নিকট এক হাজার দীনার ঋণ চাইলে সে আমার কাছে যামিনদার চেয়েছিল। আমি বলেছিলাম, আল্লাহই যামিন হিসাবে যথেষ্ট।

এতে সে রাজী হয়। তারপর সে আমার কাছে সাক্ষী চেয়েছিল, আমি বলেছিলাম সাক্ষী হিসাবে আল্লাহই যথেষ্ট, তাতে সে রাজী হয়ে যায়। আমি তার ঋণ (যথাসময়ে) পরিশোধের উদ্দেশ্যে যানবাহনের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি, কিন্তু পাইনি।

তাই আমি তোমার নিকট সোপর্দ করলাম, এই বলে সে কাষ্ঠখণ্ডটি সমুদ্রে নিক্ষেপ করল। আর কাষ্ঠখণ্ডটি সমুদ্রে প্রবেশ করল। অতঃপর লোকটি ফিরে গেল এবং নিজের শহরে যাওয়ার জন্য যানবাহন খুঁজতে লাগল।

ওদিকে ঋণদাতা এই আশায় সমুদ্রতীরে গেল, হয়তোবা ঋণগ্রহীতা কোন নৌযানে করে তার মাল নিয়ে এসেছে। তার দৃষ্টি কাষ্ঠখণ্ডটির উপর পড়ল, যার ভিতরে মাল ছিল।

সে কাষ্ঠখণ্ডটি তার পরিবারের জ্বালানীর জন্য বাড়ি নিয়ে গেল। যখন সে তা চিরল, তখন সে মাল ও পত্রটি পেয়ে গেল।

কিছুদিন পর ঋণগ্রহীতা এক হাজার দীনার নিয়ে এসে হাযির হল এবং বলল, আল্লাহর কসম! আমি আপনার মাল যথাসময়ে পৌঁছিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে সব সময় যানবাহনের খোঁজে ছিলাম। কিন্তু আমি যে নৌযানে এখন আসলাম, তার আগে আর কোন নৌযান পাইনি।

ঋণদাতা বলল, তুমি কি আমার নিকট কিছু পাঠিয়েছিলে? ঋণগ্রহীতা বলল, আমি তো তোমাকে বললামই এর আগে আর কোন নৌযান আমি পাইনি।

সে বলল, তুমি কাঠের টুকরোর ভিতরে যা পাঠিয়েছিলে, তা আল্লাহ তোমার পক্ষ হতে আমাকে আদায় করে দিয়েছেন। তখন সে আনন্দচিত্তে এক হাজার দীনার নিয়ে ফিরে চলে গেল। সহিহ বুখারি, হাদিস-২২৯১।

news zone
জানাযা নামাজ পড়ার পদ্ধতি
জানাযার নামাজ ফরজে কিফায়া। এ নামাজ মুসল্লিদের জন্য সাওয়াব বর্ধন এবং মৃত ব্যক্তির জন্য সুপারিশ। 

জানাযায় লোক সংখ্যা বেশি হওয়া মুস্তাহাব এবং মুসল্লি সংখ্যা যত বাড়তে ততই উত্তম। তবে কাতার বেজোড় হওয়া উত্তম। 

জানাযার নামাজ মূলত মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া ও ইস্তেগফার। জানাযার নামাজ পড়ার পদ্ধতি তুলে ধরা হলো-

১. প্রথমত মৃত ব্যক্তিকে ক্বিবলার দিকে সম্মুখে রেখে ইমাম ও মুসল্লিদের দাঁড়ানো।

২. মুসল্লীরা নামাজের অজুর ন্যায় অজু করে ইমামের পিছনে ক্বিবলামুখী হয়ে দাঁড়ানো।

৩. মৃত ব্যক্তি পুরুষ হলে ইমাম তার মাথার পাশে দাঁড়ানো। আর মহিলা হলে কফিনের মাঝ বরাবর দাঁড়ানো। মৃত ব্যক্তির মাঝ বরাবর দাঁড়ানোতে কোনো দোষ নেই।

৪. জানাযার নিয়ত করে চার তাকবিরের সহিত নামাজ আদায় করা।

৫. কাঁধ বা কানের লতি পর্যন্ত দু’হাত উত্তোলন করে আল্লাহু আকবার বলে নিয়ত বাঁধা।

৬. অন্যান্য নামাজের ন্যায় ডান হাত বাম হাতের উপর রাখা।

৭. ছানা পড়া (কেউ কেউ সুরা ফাতিহা পড়ে অন্যান্য সুরা মিলানোর কথা উল্লেখ করেছেন।)

৮. দ্বিতীয় তাকবিরের পর দরূদে ইবরাহিম পড়া।

৯. তৃতীয় তাকবির দিয়ে ইখলাসের সঙ্গে হাদিসে বর্ণিত দোয়াসমূহের মাধ্যমে মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করা।

১০. চতুর্থ তাকবির দিয়ে যথাক্রমে ডানে ও বামে সালাম ফিরানোর মাধ্যমে জানাযার নামাজ শেষ করা।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে মৃত ব্যক্তির মাগফিরাত কামনায় এবং নিজেদের সাওয়াব বৃদ্ধিতে সুন্দরভাবে জানাযার নামাজ আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

news zone
৪০ লাখ সওয়াব পাওয়া যায় যে দোয়া পাঠে
৪০ লাখ সওয়াব পাওয়া যায় যে দোয়া পাঠে



ওমর শাহ : 

বিশিষ্ট সাহাবি হজরত তামিম দারি রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি এ বাক্য দশ বার পড়বে সে চল্লিশ লাখ সওয়াব পাবে। 

বাক্যটি হলো,
أَشْهَدُ أَنْ لاَ إله  إِلاَّ الله، وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ، إِلهاً وَاحِداً أَحَداً صَمَداً لَمْ يَتَّخِذْ صَاحِبَةً وَلاَ وَلَداً
وَلَمْ يَكُنْ لَهُ كُفُواً أَحَدٌ

উচ্চারণ: 

আশহাদুআল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, ইলাহান ওয়াহিদান, আহাদান সামাদান, লাম ইয়াত্তাখিজ সাহিবাতান, ওয়ালা ওয়ালাদান; ওয়ালাম ইয়াকুল লাহু কুফুওয়ান আহাদ।

অর্থ: 
আমি স্বাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত আর কোনো উপাস্য নেই। তিনি একা, তার কোনো শরিক নেই। একক উপাস্য, একাই, অমুখাপেক্ষী, তার স্ত্রী-সন্তান নেই। তার সমকক্ষও কেউ নেই।

news zone
ইতিকাফ ও পেশাদারিত্ব
নবীদের উম্মতদের ইবাদত-বন্দেগির বিষয়ে আলোচনা


ওয়ালি উল্লাহ সিরাজ: 

শবে কদরের সন্ধান কে না করতে চায়! একবার রাসুল (সা.) তাঁর পূর্ববর্তী নবীদের উম্মতদের ইবাদত-বন্দেগির বিষয়ে আলোচনা করছিলেন। 

একপর্যায়ে তিনি বললেন, বনী ইসরাইলের এক ব্যক্তি হাজার বছর দিনে জিহাদে ও রাতে নফল ইবাদত করে কাটিয়েছেন। তখন সাহাবায়ে কেরাম পরস্পর আলোচনা করছিলেন যে আগেকার উম্মতদের কত সৌভাগ্য! তাঁরা হায়াতও বেশি পেয়েছেন, আমলও বেশি করেছেন, আর আমাদের হায়াতও কম আমলও কম। 

আমাদের আয়ু কম হওয়ায় আমরা আমলের দিক দিয়ে তাঁদের থেকে অনেক পেছনে পড়ে গেলাম। তখন আল্লাহ সূরা কদর নাজিল করলেন। এ সূরায় আল্লাহপাক উম্মতে মুহাম্মাদি (সা.)-কে সুসংবাদ দিলেন যে কোনো উম্মত যদি জীবনে শবে কদর শুধু একবার পেয়ে যায় এবং ওই রাতকে যথাযথ কদর করে ও ইবাদত করে, তাহলে সে যেন হাজার মাসের (তিরাশি বছর চার মাসের) চেয়ে অধিককাল ইবাদত করল।

কোনো ডাক্তার যদি ইতিকাফ করেন, এমতাবস্থায় মসজিদে অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখে বা রোগীর অবস্থার বিবরণ শুনে চিকিৎসা করতে পারবেন বা ব্যবস্থাপত্র লিখে দিতে পারবেন। সে রোগী ইতিকাফে অবস্থানকারী হোক বা না হোক। 

এটি ইতিকাফের পরিপন্থী নয়; বরং এতে বেশি নেকি লাভ হবে। কিন্তু এর জন্য কোনো ফি বা বিনিময় গ্রহণ করা যাবে না; তবে কেউ নিঃশর্ত হাদিয়া প্রদান করলে তা গ্রহণ করা জায়েজ। (ফাতাওয়া দারুল উলুম)।

news zone
লাইলাতুল কদর এর মাহাত্ম
লাইলাতুল কদর এর মাহাত্ম


‘লাইলাতুল কদর’ আরবি শব্দ। শবে কদর হলো ‘লাইলাতুল কদর’-এর ফারসি পরিভাষা। ‘শব’ অর্থ রাত আর আরবি ‘লাইলাতুন’ শব্দের অর্থও রাত বা রজনী। কদর অর্থ সম্মানিত, মহিমান্বিত। সুতরাং লাইলাতুল কদরের অর্থ সম্মানিত রজনী বা মহিমান্বিত রজনী।

পবিত্র কুরআন ও সহিহ হাদিস দ্বারা লাইলাতুল কদরের গুরুত্ব বুঝে আসে। ‘শবে বরাত’ ও শবে বরাতের হাদিসগুলোর বর্ণনা নিয়ে হাদিস বিশেষজ্ঞ ও ফকিহদের মধ্যে যে সংশয় রয়েছে, লাইলাতুল কদরের ব্যাপারে তার কোনোই অবকাশ নেই। পবিত্র কুরআন, নির্ভরযোগ্য হাদিস ও রাসূলুল্লাহ সা: এর লাইলাতুল কদরের জন্য গৃহীত কর্মতৎপরতা লাইলাতুল কদরের গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

এ সম্মানিত রজনীর গুরুত্ব সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি এ কুরআনকে কদরের রাতে নাজিল করেছি। তুমি কি জানো কদরের রাত কী? কদরের রাত হাজার মাস থেকেও উত্তম ও কল্যাণময়’ (সূরা আল কদর : ১-৩)। এই রাত কোন মাসে? এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন, ‘রমজান এমন মাস যাতে কুরআন নাজিল হয়েছে’ (সূরা বাকারা : ১৮৫)। এই রাত রমজানের কোন তারিখে? রাসূলুল্লাহ সা: একটি রহস্যময় কারণে তারিখটি সুনির্দিষ্ট করেননি। ইমাম বুখারি, ইমাম মুসলিম, ইমাম আহমদ ও ইমাম তিরমিজি কর্তৃক বর্র্ণিত হাদিসে বলা হয়েছে, হজরত আয়েশা রা: বর্ণনা করেছেন, নবী করিম সা. বলেছেন, ‘কদরের রাতকে রমজানের শেষ দশ রাতের কোন বেজোড় রাতে খোঁজ করো।’

হজরত আবু বকর রা. ও হজরত আবব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা: থেকে বর্ণিত হাদিস থেকেও এই একই ধরনের তথ্য পাওয়া যায়। অবশ্য কোনো কোনো ইসলামী মনীষী নিজস্ব ইজতিহাদ, গবেষণা, গাণিতিক বিশ্লেষণ ইত্যাদির মাধ্যামে রমজানের ২৭ তারিখের রাতে (অর্থাৎ ২৬ রোজার দিবাগত রাতে) শবে কদর হওয়ার অধিক সম্ভাবনার কথা জোর দিয়ে বলেছেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সা: এটাকে সুনির্দিষ্ট করেননি; বরং কষ্ট করে খুঁজে নিতে বলেছেন।

মহিমান্বিত এ রাতকে মহান আল্লাহ রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতে লুকিয়ে রেখেছেন। বান্দাহ বিনিদ্র্র রজনী কাটাবে, সবর করবে এর মধ্যে খুঁজে পাবে সম্মানিত রাত, পাবে আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাত; ফেরেশতার অদৃশ্য মোলাকাতে সিক্ত হবে তার হৃদয়, আপন রবের ভালোবাসায় হবে সে উদ্বেলিত। এ যেন দীর্ঘ বিরহের পর আপনজনকে ফিরে পাওয়ার আনন্দ। এ দীর্ঘ প্রতিক্ষার কষ্ট-বিরহের মাধ্যমে রব তার বান্দাহকে আরো আপন করে নেন। কাজেই শেষ দশ দিনের বেজোড় রাতগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ইবাদতে মশগুল হতে হবে। প্রতিটি রাতকেই লাইলাতুল কদর মনে করতে হবে। তা হলে লাইলাতুল কদর আল্লাহর মেহেরবানিতে হাতছাড়া হবে না ইনশাআল্লাহ। রমজানের ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯ তারিখের রাতগুলোই ( অর্থাৎ ২০, ২২, ২৪, ২৬ ও ২৮ শে রোজার দিবাগত রাত ) হলো শেষ দশকের বেজোড় রাত।

এ রাত হাজার মাস থেকে উত্তম ও কল্যাণময় (কুরআন)। এ রাতেই পবিত্র কুরআন নাজিল করা হয়েছে (কুরআন)। এ রাতে ফেরেশতা নাজিল হয় এবং আবেদ বান্দাদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হয়। ফজর পর্যন্ত এ রাতে পুরোপুরি শান্তি ও নিরাপত্তার (কুরআন)। এ রাতে প্রত্যেকটি ব্যাপারে অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত ও সুদৃঢ় ফায়সালা জারি করা হয় (কুরাআন)। এ রাতে ইবাদতে মশগুল বান্দাহদের জন্য অবতরণকৃত ফেরেশতারা দোয়া করেন (হাদিস)।

গুনাহ মাফ

‘যে ব্যক্তি লাইলাতুল কদরে ঈমান সহকারে ও আল্লাহর কাছ থেকে বড় শুভফল লাভের আশায় ইবাদতের জন্য দাঁড়িয়ে থাকবে, তার পেছনের সব গুনাহ মাফ হয়ে যাবে’ (বুখারি ও মুসলিম)। এ রাতের কল্যাণ থেকে একমাত্র হতভাগ্য লোক ছাড়া আর কেউ বঞ্চিত হয় না (ইবনে মাজাহ ও মিশকাত)।

মুসনাদে আহমেদ গ্রন্থে হজরত ওবায়দা ইবনে সামেত বর্ণিত হাসিসে উদ্ধৃত হয়েছে- ‘নবী করিম সা: বলেছেন- ‘কদরের রাত রমজান মাসের শেষ দশ রাতে রয়েছে। যে ব্যক্তি এর শুভফল লাভের উদ্দেশ্যে ইবাদতের জন্য দাঁড়িয়ে থাকবে, আল্লাহ তার আগের ও পেছনের গুনাহ মাফ করে দেবেন।’

রাসূল সা: রমজানের শেষ দশ দিন মসজিদে ইতেকাফে থাকতেন এবং ইবাদতে গভীর মনোনিবেশ করতেন।

কাজেই আমরা কোনো একটা বিশেষ রাতকে নির্দিষ্ট না করে হাদিস অনুযায়ী অন্তত রমজানের শেষ দশ দিনের বেজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল কদরের সৌভাগ্য লাভের আশায় ইবাদতে মশগুল হই। আমরা এতে অবহেলা করলে হাদিসের ভাষায় হতভাগ্য হিসেবে চিহ্নিত হবো। রাসূল সা: বলেন- ‘যে ব্যক্তি এ রাত থেকে বঞ্চিত হবে সে সমগ্র কল্যাণ ও বরকত থেকে বঞ্চিত হবে। এর কল্যাণ থেকে একমাত্র হতভাগ্য লোক ছাড়া আর কেউ বঞ্চিত হয় না’ (মিশকাত)।

news zone
হযরত আলী রা. এর শাহাদাত বরণ
হযরত আলী রা. এর শাহাদাত বরণ


হজরত আলি রা.। যুবকদের মধ্যে ইসলাম গ্রহণে তিনিই ছিলেন প্রথম। ২১ রমজান তিনি এক মুনাফিকের হাতে শাহাদাত বরণ করেন।

তাঁর পিতা আবু তালিব, যার তত্ত্বাবধানে ছিলেন বিশ্বনবি। তাঁর মাতা ফাতিমা বিনতে আসাদ, যিনি বিশ্বনবির লালন-পালনে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। হজরত আলির পিতা আবদুল্লাহ, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পিতা আবদুল্লাহ এবং যুবাইর এ তিনজন ছিল সহদর ভাই।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বনু হাশেমকে ইসলামের দাওয়াত দেয়ার সময় হজরত আলি বিশ্বনবির সঙ্গে থাকার কথা ঘোষণা দিয়েছিলেন। তখন তিনি ছিলেন কিশোর। এমনকি মক্কার চরম বিপদের সময় বিশ্বনবি হজরত আলিকে হিজরতের রাতে তাঁর বিছানায় শুইয়ে রেখে গিয়েছিলেন। যাতে বিশ্বনবির নিকট মানুষের গচ্ছিত আমানত তিনি প্রত্যার্পন করে মদিনায় হিজরত করেন।

হজরত আলি রাদিয়াল্লাহু তাঁর জীবদ্দশায় সংঘটিত প্রত্যেকটি যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনি বীরত্ব ও সাহসিকতার এমন এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন, যা আজো ইসলামের ইতিহাসে স্মরণীয়।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর কলিজার টুকরা হজরত ফাতিমাকে তাঁর কাছে বিবাহ দেন। তিনি ছিলেন জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় অপ্রতিদ্বন্দ্বি। তাঁর সম্পর্কে বিশ্বনবির বক্তব্য ছিল এমন যে, আমি জ্ঞানে শহর আর আলি হলো সে শহরের দরজা। তাইতো হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় বাইয়াতে রিদওয়ানের চুক্তিপত্র তিনিই লিখেন।

৯ম হিজরি সনে হজরত আবু বকরের নেতৃত্বে হজ পালনের সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশে তিনি সুরা তাওবার ১ থেকে ৩৭ আয়াত পর্যন্ত তিলাওয়াত করে হজে আগত লোকদেরকে শোনান। এ আয়াতগুলোতে  ছিল মুক্তির ঘোষণা এবং কাফের মুশরিকদের হজ্ব সম্পাদনে অনুমতি দানের অস্বীকৃতি।

ইসলামের ইতিহাসে যুবকদের মধ্যে প্রথম ইসলাম গ্রহণকারী হজরত আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুকে ১৯ রমজান ফজরের নামাজ আদায় করার সময় ইবনে মুলযেমের তরবারির আঘাতে আহত হন। অবশেষে ৪০ হিজরির ২১ রমজান শাহাদাত বরণ করেন।

news zone